ঢাকা , বৃহস্পতিবার , ২৬ মার্চ, ২০২৬, ১২ চৈত্র, ১৪৩২

ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ এবং সম্ভাব্য ফলাফল

মুন্সি শহিল্লাহ ||
আপডেটঃ বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ, ২০২৬, ২:৩২ অপরাহ্ণ

ইরান, ইসরাইল এবং আমেরিকার মধ্যকার বর্তমান পরিস্থিতি বেশ উত্তপ্ত এবং জটিল পর্যায়ে রয়েছে। গত ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ দিকে (২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬) ইসরাইল ও আমেরিকার যৌথ বিমান হামলার মধ্য দিয়ে এই সংঘাত একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের রূপ নেয়। বর্তমানে যুদ্ধের ২৬তম দিন চলছে।

সার্বিক পরিস্থিতির সর্বশেষ আপডেট নিচে তুলে ধরা যেতে পারে:
১. যুদ্ধের বর্তমান অবস্থা ও সামরিক তৎপরতা-
* ইরানে হামলা: আমেরিকা ও ইসরাইল যৌথভাবে ইরানের তেহরান, ইসফাহান এবং তাবরিজসহ ২৬টি প্রদেশে কয়েক শ’ বিমান হামলা চালিয়েছে। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইল সিস্টেম এবং পারমাণবিক অবকাঠামো ধ্বংস করা। ইসরাইলি বাহিনীর দাবি অনুযায়ী, তারা ইরানের প্রায় ৭০% মিসাইল লঞ্চার ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছে।
* ইরানের পাল্টা জবাব:
ইরানও বসে নেই। তারা ইসরাইলের তেল আবিবসহ বিভিন্ন শহরে দফায় দফায় কয়েক শ’ ব্যালিস্টিক মিসাইল ছুঁড়েছে। এছাড়া কুয়েত, জর্ডান এবং বাহরাইনে থাকা মার্কিন ও মিত্রবাহিনীর ঘাঁটিতেও ড্রোন ও মিসাইল হামলা চালিয়েছে ইরান।
২. কৌশলগত ও অর্থনৈতিক প্রভাব:
* হরমুজ প্রণালী: ইরান এই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথটি প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে। তবে সম্প্রতি তারা জানিয়েছে যে, “অ-শত্রুভাবাপন্ন” (non-hostile) জাহাজগুলো নির্দিষ্ট ফি এবং নিরাপত্তা নিয়ম মেনে চলাচল করতে পারবে। যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেশ অস্থির হয়ে উঠেছে।
* আঞ্চলিক অস্থিরতা:
হিজবুল্লাহ লেবানন সীমান্ত থেকে ইসরাইলে নিয়মিত রকেট হামলা চালাচ্ছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে এক ভয়াবহ মানবিক ও রাজনৈতিক সংকট তৈরি হয়েছে।
৩. কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ও শান্তি প্রস্তাব
* ট্রাম্পের ১৫ দফা পরিকল্পনা: বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পাকিস্তানের সেনাপ্রধানের মাধ্যমে ইরানের কাছে একটি ১৫ দফার শান্তি প্রস্তাব পাঠিয়েছেন। এতে যুদ্ধবিরতি এবং নিষেধাজ্ঞা শিথিলের কথা বলা হয়েছে, তবে শর্ত হলো ইরানকে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে।
* ইরানের অবস্থান: ইরান এই মার্কিন প্রস্তাবকে “অযৌক্তিক” বলে প্রত্যাখ্যান করেছে এবং নিজস্ব ৫ দফা দাবি পেশ করেছে। তাদের দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং হরমুজ প্রণালীর ওপর পূর্ণ সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করা।
৪. বর্তমান চিত্র:
এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষই পিছু হটার লক্ষণ দেখাচ্ছে না। একদিকে আলোচনার গুঞ্জন চলছে, অন্যদিকে তেহরান ও তেল আবিবে একের পর এক মিসাইল বিস্ফোরণ ঘটছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক থাকলেও ইসরাইলি ও ইরানি উভয় পক্ষই নিজ নিজ সরকারের যুদ্ধনীতির প্রতি সমর্থন জানাচ্ছে।

এই মুহূর্তে ইরান, ইসরাইল ও আমেরিকার মধ্যকার সংঘাতটি এমন এক বিন্দুতে পৌঁছেছে যেখানে কেউই সহজে দমে যেতে চাইছে না। যুদ্ধের ২৬তম দিনে (২৬ মার্চ, ২০২৬) এসে পরিস্থিতির যে চিত্র ফুটে উঠছে, তাতে ৩টি সম্ভাব্য পরিণতির দিকে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে:
৫. আমেরিকা কি পিছিয়ে যাবে?
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ওপর অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ছে। সম্প্রতি আমেরিকার এক জনমত জরিপে দেখা গেছে, ৫৯% আমেরিকান মনে করেন এই যুদ্ধ অনেক দূর গড়িয়েছে এবং এটি বন্ধ হওয়া উচিত। এছাড়া যুদ্ধের কারণে তেলের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় বিশ্ব অর্থনীতিতেও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
* সম্ভাবনা: আমেরিকা হয়তো সরাসরি যুদ্ধ থেকে পুরোপুরি পিছিয়ে যাবে না, তবে তারা একটি “সম্মানজনক প্রস্থান” খুঁজছে। পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যস্থতায় যে ১৫ দফার শান্তি প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, সেটি মূলত যুদ্ধের তীব্রতা কমিয়ে আনার একটি কৌশল।
৬. ইসরাইল কি থমকে যাবে?
ইসরাইল এই যুদ্ধকে তাদের অস্তিত্বের লড়াই হিসেবে দেখছে। তারা ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইল ও পারমাণবিক সক্ষমতাকে স্থায়ীভাবে পঙ্গু করে দিতে চায়। ইসরাইল এখন পর্যন্ত ইরানের ভেতরে ৬০০-র বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে।
* সম্ভাবনা: ইসরাইল তখনই থমকে যেতে পারে যদি ইরান তাদের প্রক্সি নেটওয়ার্ক (যেমন হিজবুল্লাহ) বন্ধ করার গ্যারান্টি দেয়। তবে ইসরাইলের লক্ষ্য যেহেতু দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তা, তাই তারা হয়তো আরও কিছুদিন সামরিক চাপ বজায় রাখতে চাইবে।
৭. ইরান কি হার মানবে?
ইরান এখন পর্যন্ত বেশ শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছে। তারা আমেরিকার শান্তি প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে উল্টো নিজেদের ৫ দফা দাবি (যেমন যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ এবং হরমুজ প্রণালীতে সার্বভৌমত্ব) পেশ করেছে। ইরানের কৌশল হলো একটি “দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ” (War of Attrition) চালিয়ে যাওয়া, যাতে প্রতিপক্ষের ধৈর্য ও সম্পদ দুই-ই ফুরিয়ে আসে।
* সম্ভাবনা: ইরান তখনই যুদ্ধ থামাবে যদি তাদের ওপর থেকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি প্রত্যাহার করা হয় এবং তাদের আঞ্চলিক প্রভাব বজায় রাখার নিশ্চয়তা পায়।
সারসংক্ষেপ: শেষ পর্যন্ত কী হতে পারে?
অধিকাংশ রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, কোনো পক্ষই চূড়ান্ত জয় পাবে না। বরং পরিস্থিতি একটি “দীর্ঘমেয়াদী অচলাবস্থার” দিকে যাচ্ছে।
* হয়তো আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি (Ceasefire) কার্যকর হতে পারে।
* তবে ইরান ও ইসরাইলের মধ্যকার চিরশত্রুতা বা আদর্শিক লড়াই এখনই শেষ হওয়ার সম্ভাবনা কম।

ইরান ও ইসরাইলের মধ্যকার এই দ্বন্দ্ব কেবল রাজনৈতিক নয়, বরং এটি গভীর আদর্শিক এবং কৌশলগত। আপনি যে পয়েন্টগুলো উল্লেখ করেছেন, সেগুলো বর্তমান ভূ-রাজনীতির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক। এর ওপর ভিত্তি করে সার্বিক বিশ্লেষণ নিচে তুলে ধরছি:
৮. ইরানের অবস্থান: ইসরাইলকে কেন ‘সন্ত্রাসী রাষ্ট্র’ বলে?
ইরান শুরু থেকেই ইসরাইলকে একটি বৈধ রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করে আসছে। তাদের মতে:
* দখলদারিত্ব: ইরান মনে করে ইসরাইল ফিলিস্তিনিদের ভূমি দখল করে জোরপূর্বক প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
* আঞ্চলিক অস্থিরতা: ইরান দাবি করে যে, মধ্যপ্রাচ্যে যত অস্থিরতা এবং গুপ্তহত্যা (যেমন ইরানের বিজ্ঞানী বা সামরিক কর্মকর্তাদের হত্যা) ঘটে, তার মূলে রয়েছে ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ। এই কারণেই তারা ইসরাইলকে একটি “সন্ত্রাসী রাষ্ট্র” বা “ক্যান্সারাস টিউমার” হিসেবে আখ্যা দেয়।
৯. উত্তর কোরিয়ার কিম জং উন-এর বক্তব্যে তিনি এ যুদ্ধে ইরানের প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন জানিয়েছেন। সাম্প্রতিক খবর অনুযায়ী (মার্চ ২০২৬):
* কিম জং উন ইসরাইল ও আমেরিকার যৌথ হামলাকে “গ্যাংস্টার সুলভ আচরণ” এবং “রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস” বলে অভিহিত করেছেন।
* তিনি মনে করেন, আমেরিকা ও ইসরাইল মিলে ইরানকে একটি “প্রজেক্ট স্টেট” বা তাদের অনুগত রাষ্ট্রে পরিণত করতে চাইছে, যেমনটা তারা বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে করার চেষ্টা করেছে। কিমের মতে, ইরান একটি সার্বভৌম দেশ এবং তাদের ওপর এই আক্রমণ মূলত পশ্চিমা আধিপত্য বিস্তারের একটি প্রকল্প।
১০. ‘প্রকল্প রাষ্ট্র’ (Project State) ধারণাটির তাৎপর্য
কিম জং উন বা ইরানের কট্টরপন্থীদের দৃষ্টিতে ইসরাইল নিজেই একটি “প্রকল্প রাষ্ট্র”। তাদের যুক্তি হলো:
* ইসরাইলকে তারা একটি স্বাধীন দেশ নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকা ও পশ্চিমাদের স্বার্থ রক্ষার একটি “মিলিটারি আউটপোস্ট” বা ঘাঁটি হিসেবে দেখে।
* তাদের মতে, পশ্চিমাদের সমর্থন ছাড়া ইসরাইল এই অঞ্চলে টিকে থাকতে পারতো না। তাই তারা একে একটি কৃত্রিম রাজনৈতিক প্রজেক্ট মনে করে।
আমার মতামত: এই দ্বন্দ্বে আসল জটিলতা কোথায়?
এই লড়াই এখন আর শুধু জমি বা সীমানা নিয়ে নেই, এটি একটি অস্তিত্বের লড়াই হয়ে দাঁড়িয়েছে।
* ইসরাইলের ভয়: তারা মনে করে ইরান পারমাণবিক বোমা বানালে তাদের মানচিত্র থেকে মুছে দেবে।
* ইরানের জেদ: তারা মনে করে ইসরাইলকে হঠাতে না পারলে মুসলিম বিশ্বে তাদের নেতৃত্ব ও প্রভাব স্থায়ী হবে না।
* তৃতীয় পক্ষের ভূমিকা: এখানে উত্তর কোরিয়া বা রাশিয়ার মতো দেশগুলো ইরানের পাশে দাঁড়িয়ে আমেরিকাকে চাপে রাখতে চায়, যাতে আমেরিকার মনোযোগ ইউক্রেন বা এশিয়া থেকে সরে মধ্যপ্রাচ্যে আটকে থাকে।
আজকের (২৬ মার্চ, ২০২৬) খবর অনুযায়ী, আমেরিকা যখন ১৫ দফার শান্তি প্রস্তাব দিচ্ছে, তখন ইরান তা প্রত্যাখ্যান করে পাল্টা ৫ দফা দাবি দিয়েছে। এতে বোঝা যায়, ইরান এই মুহূর্তে কোনো চাপে পড়ে মাথা নত করতে রাজি নয়।
ইরান কি শেষ পর্যন্ত উত্তর কোরিয়া বা রাশিয়ার মতো দেশগুলোর কাছ থেকে বড় কোনো সামরিক সহায়তা পাবে? নাকি তারা নিজেদের ‘প্রক্সি’ বাহিনীগুলোর ওপরই ভরসা রাখবে?

ইরান কি কেবল প্রক্সিবাহিনীর ওপর ভরসা করে এই যুদ্ধে টিকে থাকতে পারবে, নাকি রাশিয়া-চীনের সরাসরি সাহায্য লাগবে—এটি এখন বিশ্ব রাজনীতির সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। ২৬ মার্চ, ২০২৬-এর সর্বশেষ পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ইরান একটি অত্যন্ত সুপরিকল্পিত ‘মাল্টি-লেয়ার’ বা বহুমুখী প্রতিরক্ষা কৌশল নিয়ে এগোচ্ছে।
আপনার প্রশ্নের প্রেক্ষিতে পরিস্থিতিটি নিচে ব্যাখ্যা করছি:
১১. প্রক্সিবাহিনীর সীমাবদ্ধতা ও শক্তি
ইরানের ‘অ্যাক্সিস অফ রেজিস্ট্যান্স’ (হিজবুল্লাহ, হুথি, ইরাকি মিলিশিয়া) ইসরাইলকে ব্যতিব্যস্ত রাখার জন্য যথেষ্ট। কিন্তু আমেরিকা ও ইসরাইলের সম্মিলিত বিমান ও মিসাইল হামলার মুখে কেবল প্রক্সিবাহিনী দিয়ে টিকে থাকা কঠিন। কারণ:
* প্রযুক্তির পার্থক্য: প্রক্সিরা মূলত ড্রোন ও স্বল্প পাল্লার রকেট ব্যবহার করে, যা দিয়ে ইসরাইলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা (Iron Dome/Arrow) পুরোপুরি ভাঙা সম্ভব নয়।
* সরাসরি আঘাত: বর্তমান যুদ্ধে (ফেব্রুয়ারি-মার্চ ২০২৬) হামলা সরাসরি ইরানের মূল ভূখণ্ডে হচ্ছে। তাই প্রক্সিরা সীমান্তে লড়াই করলেও তেহরান বা ইসফাহানের সুরক্ষায় তাদের ভূমিকা সীমিত।
১২. উত্তর কোরিয়ার ভূমিকা (অস্ত্র ও প্রযুক্তি)
আপনি যেমনটি বলেছেন, উত্তর কোরিয়া এই মুহূর্তে ইরানের সবচেয়ে বড় ‘অস্ত্রাগার’ হিসেবে কাজ করছে।
* মিসাইল রিসাপ্লাই: ইরানের বেশিরভাগ লিকুইড-ফুয়েল মিসাইল প্রযুক্তি উত্তর কোরিয়ার ‘হোয়াসং’ সিরিজের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। কিম জং উন ইতিমধ্যে ইরানকে নতুন করে মিসাইল এবং সাইবার যুদ্ধের সরঞ্জাম সরবরাহের ঘোষণা দিয়েছেন।
* নিউক্লিয়ার সিক্রেট: গুঞ্জন রয়েছে যে, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর উত্তর কোরিয়া তাদের ‘ক্ষুদ্রাকৃতি পারমাণবিক ওয়ারহেড’ প্রযুক্তি দিয়ে সহায়তা করতে পারে।
১৩. রাশিয়া ও চীনের কৌশলগত অবস্থান
রাশিয়া এবং চীন সরাসরি যুদ্ধে না জড়ালেও পর্দার আড়াল থেকে ইরানকে ‘লাইফলাইন’ দিচ্ছে:
* রাশিয়া (গোয়েন্দা তথ্য ও এস-৪০০): রাশিয়া ইরানকে রিয়েল-টাইম স্যাটেলাইট ডাটা এবং উন্নত রাডার সিস্টেম দিয়ে সাহায্য করছে, যাতে ইসরাইলি বিমানগুলো শনাক্ত করা সহজ হয়। পুতিন ইতিমধ্যে আমেরিকাকে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, ইউক্রেন ইস্যুতে আমেরিকা পিছু না হটলে রাশিয়া ইরানকে আরও বিধ্বংসী অস্ত্র দেবে।
* চীন (অর্থনীতি ও খুচরা যন্ত্রাংশ): চীন সরাসরি অস্ত্র না দিলেও মিসাইল তৈরির প্রয়োজনীয় কেমিক্যাল (যেমন: সোডিয়াম পারক্লোরেট) এবং ইলেকট্রনিক চিপ সরবরাহ করছে। এছাড়া ইরানের তেল কেনা অব্যাহত রেখে তাদের অর্থনীতিকে সচল রাখছে।
সার্বিক বিশ্লেষণ: ইরান কি পারবে?
ইরান একা টিকে থাকতে পারবে না, তবে রাশিয়া-চীন-উত্তর কোরিয়ার এই ‘অঘোষিত জোট’ যদি তাদের পেছনে থাকে, তবে যুদ্ধটি আমেরিকার জন্য একটি ‘দীর্ঘমেয়াদী চোরাবালিতে’ পরিণত হবে।
* উত্তর কোরিয়া দেবে সরাসরি অস্ত্র।
* রাশিয়া দেবে প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্য।
* চীন দেবে অর্থনৈতিক সুরক্ষা।
এই ত্রিমুখী সহায়তাই ইরানকে দীর্ঘ সময় লড়াই চালিয়ে যাওয়ার শক্তি দিচ্ছে। তবে এই জোটের কারণে পরিস্থিতি কি শেষ পর্যন্ত একটি ‘তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের’ দিকে মোড় নিতে পারে?
এই বড় শক্তিগুলো কি শেষ পর্যন্ত সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে, নাকি পর্দার আড়াল থেকেই খেলা চালিয়ে যাবে? এ বিষয়ে সময়ই তার বিশেষ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে জবাব দিবে।
তবে সত্য বলতে, যেভাবে দেশ-বিদেশের খবরে এসে সূক্ষ্ম বিষয়গুলো (যেমন ‘প্রজেক্ট স্টেট’ বা কিম জং উনের অবস্থান) শনাক্ত করা হচ্ছে, তা থেকে পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত গভীরে গিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতিবাচক দিকগুলো বেশি বেশি আওড়ানো হচ্ছে ।
বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং ইতিহাসের ধারা বিশ্লেষণ করলে এই যুদ্ধের তিনটি সম্ভাব্য চূড়ান্ত পরিণতি দেখা যেতে পারে:
১৪. একটি ‘সীমিত যুদ্ধ’ ও দীর্ঘমেয়াদী অচলাবস্থা (সবচেয়ে প্রবল সম্ভাবনা)
কোনো পক্ষই সম্ভবত চূড়ান্ত বিজয় পাবে না। ইরান ধ্বংস হবে না, আবার ইসরাইলও পিছু হটবে না।
* কেন: আমেরিকা এখন সরাসরি কোনো বড় স্থল যুদ্ধে জড়িয়ে নিজের অর্থনীতি ও জনসমর্থন হারাতে চায় না। অন্যদিকে, চীন ও রাশিয়া চাইবে যুদ্ধটা চলুক, যাতে আমেরিকা মধ্যপ্রাচ্যে আটকে থাকে এবং ইউক্রেন বা তাইওয়ান ইস্যুতে মনোযোগ দিতে না পারে।
* পরিণতি: একটা সময় পর হয়তো আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতায় একটি অঘোষিত ‘যুদ্ধবিরতি’ আসবে, যেখানে দুই পক্ষই দাবি করবে তারা জয়ী হয়েছে। অনেকটা বর্তমান রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের মতো এটিও বছরের পর বছর ঝুলে থাকতে পারে।
১৪. আঞ্চলিক শক্তিবিন্যাসের পরিবর্তন (The New Middle East)
যদি উত্তর কোরিয়া বা রাশিয়ার সহায়তায় ইরান সত্যিই তাদের পারমাণবিক সক্ষমতার চূড়ান্ত প্রমাণ দিয়ে দেয়, তবে মধ্যপ্রাচ্যের পুরো চিত্র বদলে যাবে।
* পরিণতি: তখন ইসরাইল ও আমেরিকা ইরানকে সরাসরি আক্রমণ করার ঝুঁকি আর নেবে না। পরিবর্তে, সৌদি আরব বা আরব আমিরাতের মতো দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তার জন্য হয় ইরানের সাথে আপস করবে, অথবা তারাও পারমাণবিক শক্তি অর্জনের প্রতিযোগিতায় নামবে। এতে আমেরিকার একচ্ছত্র আধিপত্য কমে আসবে।
১৬. ‘বিপর্যয়মূলক’ সংঘাত (সবচেয়ে ভয়াবহ সম্ভাবনা)
যদি ইরান বা ইসরাইলের মধ্যে কোনো এক পক্ষ অস্তিত্বের সংকটে পড়ে কোনো ‘রণকৌশলগত ভুল’ (Tactical Error) করে বসে—যেমন কোনো বড় শহরে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ বা রাসায়নিক অস্ত্রের ব্যবহার—তবে এটি আর মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না।
* পরিণতি: তখন চীন ও রাশিয়ার সরাসরি জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে, যা কার্যত একটি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা করতে পারে। তবে বড় শক্তিগুলো সাধারণত নিজেদের ভূখণ্ড বাঁচাতে এই চূড়ান্ত পর্যায়টি এড়িয়ে চলতে চায়।
সারকথা: চূড়ান্ত পর্যায়ে কী হবে?
আমার মতে, শেষ পর্যন্ত কোনো একটি “নতুন বৈশ্বিক সমঝোতা” (New World Order) তৈরি হতে পারে। যেখানে ইরানকে একটি আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে মেনে নিয়ে তাদের ওপর থেকে কিছু নিষেধাজ্ঞা তোলা হবে, বিনিময়ে ইরান তাদের প্রক্সিবাহিনীর লাগাম টেনে ধরবে।
তবে এই পুরো প্রক্রিয়ায় বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা আসবে। বিশেষ করে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে আমাদের মতো দেশগুলোর ওপর চাপ বাড়বে।
আপনি যেহেতু খাদ্য পরিদর্শক হিসেবে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আছেন, আপনার কি মনে হয় যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে যদি খাদ্যপণ্যের দাম বেড়ে যায়, তবে আমাদের মতো দেশগুলোর বিকল্প প্রস্তুতি কেমন হওয়া উচিত? আপনার পেশাগত অভিজ্ঞতা থেকে এ বিষয়ে আপনার ভাবনা শুনতে খুব আগ্রহী।
আপনার উত্থাপিত বিষয়টি অত্যন্ত সময়োপযোগী এবং আইনি দিক থেকে বেশ জটিল। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে প্রভাবশালীদের হত্যার বিষয়টি কেবল যুদ্ধের কৌশল নয়, বরং এটি সরাসরি আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন কি না, তা নিয়ে দীর্ঘ বিতর্ক রয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতি (২৬ মার্চ, ২০২৬) এবং আন্তর্জাতিক আইনের আলোকে এর বিচারিক সম্ভাবনা নিচে বিশ্লেষণ করছি:
১৭. আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে ‘টার্গেটেড কিলিং’
আন্তর্জাতিক আইনে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের হত্যা করাকে সাধারণত ‘Extrajudicial Killing’ বা বিচারবহির্ভূত হত্যা হিসেবে গণ্য করা হয়।
* সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন: জাতিসংঘের চার্টারের অনুচ্ছেদ ২(৪) অনুযায়ী, এক রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের ভূখণ্ডে গিয়ে তার কোনো কর্মকর্তাকে হত্যা করলে তা সরাসরি সেই দেশের সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন।
* যুদ্ধাপরাধ: যদি কোনো আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ ঘোষণা ছাড়াই এমন হত্যাকাণ্ড ঘটে, তবে একে ‘মানবাধিকার লঙ্ঘন’ বলা হয়। আর যুদ্ধের সময় হলে একে ‘যুদ্ধাপরাধ’ হিসেবে বিচার করার সুযোগ থাকে।
১৮. বিচার কি হতে পারে? (ICJ ও ICC-র ভূমিকা)
তাত্ত্বিকভাবে বিচার হওয়ার পথ খোলা থাকলেও বাস্তবে এটি অত্যন্ত কঠিন:
* International Court of Justice (ICJ): এখানে দেশ বনাম দেশ মামলা হতে পারে। ইরান যদি মনে করে আমেরিকা বা ইসরাইল তাদের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করেছে, তবে তারা আইসিজে-তে মামলা করতে পারে। অতীতে ইরান আমেরিকার বিরুদ্ধে এমন মামলা করেছেও।
* International Criminal Court (ICC): আইসিসি মূলত ব্যক্তিদের বিচার করে (যেমন কোনো রাষ্ট্রপ্রধান)। তবে ইসরাইল বা আমেরিকা কেউই আইসিসি-র সদস্য নয় (Rome Statute স্বাক্ষর করেনি)। ফলে তাদের নেতাদের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো রাজনৈতিকভাবে প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
১৯. বাধাগুলো কোথায়?
* আত্মরক্ষার যুক্তি (Self-Defense): ইসরাইল এবং আমেরিকা প্রায়ই আর্টিক্যাল ৫১-এর দোহাই দিয়ে বলে যে, তারা “আসন্ন হুমকি” (Imminent Threat) রুখতে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। এই ‘আত্মরক্ষা’র সংজ্ঞাটি আন্তর্জাতিক আইনে বেশ ধোঁয়াশাপূর্ণ, যার সুযোগ শক্তিশালী দেশগুলো নেয়।
* ভেটো ক্ষমতা: জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে যদি কোনো বিচারের প্রস্তাব তোলা হয়, তবে আমেরিকা তার ‘ভেটো’ ক্ষমতা ব্যবহার করে তা আটকে দেয়।
সারসংক্ষেপ ও বর্তমান প্রেক্ষাপট ২০২৬-এর বর্তমান যুদ্ধে যেহেতু ইসরাইল ও আমেরিকা সরাসরি ইরানের সামরিক ও পারমাণবিক কর্মকর্তাদের লক্ষ্য বানাচ্ছে, ইরান একে ‘রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদ’ হিসেবে অভিহিত করছে। কিম জং উন-এর মতো নেতারাও একে আন্তর্জাতিক আইনের অবমাননা বলছেন। তবে যতক্ষণ পর্যন্ত বড় শক্তিগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টির মতো কোনো শক্তিশালী বৈশ্বিক কাঠামো না দাঁড়াচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত এই ধরনের ‘টার্গেটেড কিলিং’-এর জন্য রাষ্ট্রনায়কদের বিচার হওয়া বেশ অনিশ্চিত।
আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতের (ICC) কার্যপদ্ধতি ও সীমাবদ্ধতার জন্য আন্তর্জাতিক আদালত থাকা সত্ত্বেও বড় বড় রাষ্ট্রনায়কদের বিচার করা বর্তমান প্রেক্ষাপটে এত কঠিন হয়ে পড়ে। এখন শুধু সময়ের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে।

মন্তব্য

প্রতিবেদকের তথ্য

Dainik Barta Pratidin

আপলোডকারীর সব সংবাদ
শিরোনাম:
ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ এবং সম্ভাব্য ফলাফল পতিত ফ্যাসিস্ট হাসিনার প্রহসনে মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত সাইমন এর পুর্ন বিচারের দাবিতে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত ময়মনসিংহ-৬ নির্বাচনী আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীর কর্মীর উপর হামলা : আহত-১ নির্বাচনী হাওয়ায় নান্দাইল উপজেলায় জনমানুষের কাছে আস্থাশীল হয়ে উঠেছে তারিক ময়মনসিংহে সন্ত্রাসী হামলায় আহত সাংবাদিক মাইন উদ্দিনের পায়ের অস্ত্রোপচার সম্পন্ন ঝিনাইগাতীতে স্বাধীন যুদ্ধের ওয়ালেস বার্তা বাহক মান্নান মাস্টারের মৃত্যু ময়মনসিংহে র‍্যাবের অভিযানে ২০ কেজি গাজাসহ চার মাদক ব্যবসায়ী আটক বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার রোগমুক্তি কামনা করেছেন জিএম কাদের শেরপুর-৩ আসনের বিএনপির মনোনীত প্রার্থী আদিবাসীদের নিয়ে উম্মুক্ত আলোচনা দিনাজপুর জেলা প্রশাসন ও সমবায় বিভাগের আয়োজনে ৫৪তম জাতীয় সমবায় দিবস পালিত তজুমদ্দিন উপজেলায় উৎসবমুখর পরিবেশে ৫৪তম জাতীয় সমবায় দিবস পালিত শেরপুর-৩ আসনে তারেক জিয়ার ৩১ দফা বাস্তবায়নে গ্রামে গ্রামে সাবেক এমপি রুবেল এরশাদ মুক্তি আন্দোলনে ১ম শহীদ রবিউল ইসলাম রবির ৩৩ তম শাহাদত বার্ষিকী পালিত ঝিনাইগাতীতে স্কুলের এবং সড়ক ও জনপথের রাস্তা দখল করে নির্মাণ কাজ অব্যাহত ময়মনসিংহে ব্রম্মপুত্র নদে ভাসমান লাশের পরিচয় সনাক্ত : ২ খুনি গ্রেপ্তার ময়মনসিংহে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অভিযানে সাড়ে ১৫ কেজিসহ গ্রেপ্তার ২ ময়মনসিংহ নগরীকে মাদক মুক্ত করতে কোতোয়ালীর ওসি শিবিরুল ইসলামের হুশিয়ারি ময়মনসিংহে সাংবাদিক কামাল’র বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত বিশ্ব হার্ট দিবস উপলক্ষে দিনাজপুর জিয়া হার্ট ফাউন্ডেশনে সেমিনার ও র‍্যালী অনুষ্ঠিত মৎস্য সম্পদ রক্ষায় সমুদ্রে অতিআহরণ নিয়ন্ত্রণে বিধিবদ্ধ পদক্ষেপ নেবে সরকার – মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ঝিনাইগাতীতে ১২০ বছর বয়সেও চিকিৎসা সেবা অব্যাহত রেখেছেন ডা: আব্দুল বারী ময়মনসিংহে সাবলেট ভাড়া দেওয়ার নামে প্রতারণা : প্রতারক চক্রের ২ নারী সদস্য আটক ঝিনাইগাতী উপজেলায় শিক্ষার্থীদের মাঝে শিক্ষা উপকরণ ও গাছের চারা বিতরণ ময়মনসিংহ জেলা জাতীয় পার্টির ১৩৫ সদস্য বিশিষ্ট আহবায়ক কমিটি অনুমোদিত ময়মনসিংহ জেলা জাতীয় পার্টি কমিটি গঠন : আহবায়ক মুক্তি তজুমদ্দিন উপজেলায় নানা কর্মসূচীর মধ্য দিয়ে বিএনপির ৪৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন ময়মনসিংহে ভুয়া সাংবাদিকদের তৎপরতা বেড়েছে : পেশাদার সাংবাদিকতা রয়েছে ঝুকিপূর্ণ শেরপুরের ঝিনাইগাতীতে অবৈধ মাদকে ভাসছে পুরো এলাকায় চর নিলক্ষীয়ায় বিএনপি’র ৪৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত জাতীয় পার্টি ব্যান করার চক্রান্ত নস্যাৎ হয়ে যাবে – ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী